রাজবাড়ীর বুড়ো শিবতলার শ্মশানে ভূত চতুর্দশীর রাতে দাদুর যে অভিজ্ঞতা, তিনি আর ঘর থেকে বের হননি।
রাজবাড়ীর বুড়ো শিবতলার শ্মশানে ভূত চতুর্দশীর রাতে দাদুর যে অভিজ্ঞতা, তিনি আর ঘর থেকে বের হননি।
127 Website Views
Video Transcript
আসসালামু আলাইকুম… আমি বাবু। Horror World Global গ্লোবাল থেকে ভয়ংকর এই পর্বে আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি। আজকের রাতটা একটু অন্যরকম হতে যাচ্ছে। কারণ আজ আমি আপনাদের যে গল্পটা শোনাব, তা কোনো কল্পনা নয়। এটা বাস্তব। ভৌগোলিক স্থান, সনাতন ধর্মের শাস্ত্রীয় নিয়ম আর এক অভিশপ্ত রাতের এমন এক সত্য ঘটনা আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরব, যা শোনার পর হয়তো রাতের অন্ধকারে একা ঘরের বাইরে পা রাখতে আপনার দুবার ভাবতে হবে। ঘরের আলোটা নিভিয়ে দিন। একা থাকলে দরজাটা ভালো করে বন্ধ করে নিন। আর কানে হেডফোনটা লাগিয়ে নিন। তাহলে শুরু করা যাক।
আজকের এই লোমহর্ষক এবং হাড়কাঁপানো ঘটনাটি আমাদের ইমেইল করে পাঠিয়েছেন সৌরভ দা। ঘটনাটি তার দাদুর নিজের জীবনের এক অভিশপ্ত রাতের অভিজ্ঞতা। ঘটনাটি এতটাই ভয়ংকর যে, সৌরভ দার দাদু মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কখনো ওই বিশেষ তিথির রাতে একা ঘরের বাইরে পা রাখেননি। তবে মূল গল্পে যাওয়ার আগে আপনাদের একটা বিষয় পরিষ্কার করে দিতে চাই। যেহেতু গল্পটা একদম সত্যি এবং জায়গাগুলো আজও বর্তমান, তাই সৌরভ দার বিশেষ অনুরোধে আমরা ওই নির্দিষ্ট মহাশ্মশান, তার দাদুর নাম এবং আরও কিছু চরিত্রের আসল নাম গোপন রাখছি। বদলে আমরা কিছু ছদ্মনাম ব্যবহার করব, যাতে ওই শ্মশান বা পরিবার নিয়ে কোনো অযাচিত কৌতূহল তৈরি না হয়। তবে আপনাদের কথা দিচ্ছি—ভৌগোলিক স্থান, সনাতন পঞ্জিকার নিয়ম আর ঘটনার ভয়াবহতা একদম শতভাগ সত্যি রাখা হয়েছে। গল্পের খাতিরে সৌরভ দার দাদুর নাম দিচ্ছি—ভবতোষ ব্যানার্জী।
সময়টা ১৯৬৮ সাল। জায়গাটা রাজবাড়ী জেলা, বালিয়াকান্দি উপজেলার আড়কান্দী গ্রাম। চন্দনা নদীর পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা এক প্রাচীন জনপদ। গ্রামের এক প্রান্তে রয়েছে একটি শত বছরের পুরনো মহাশ্মশান। হয়তো আপনারা অনেকেই বুঝে গেছেন আমরা কোন শ্মশানের কথা বলছি। কিন্তু নিরাপত্তার স্বার্থে এবং যাতে ওই জায়গাটিকে নিয়ে মানুষের মধ্যে অযাচিত কৌতূহল তৈরি না হয়, সেই কারণেই আমরা এই শ্মশানের আসল নাম ব্যবহার করছি না। গল্পের খাতিরে আমরা এই শ্মশানের একটি ছদ্মনাম ব্যবহার করছি—‘বুড়ো শিবতলার মহাশ্মশান’।
লোকমুখে শোনা যায়, বহু বছর আগে এখানে তান্ত্রিকরা সাধনা করত। আর অপঘাতে মৃত, বিশেষ করে পোয়াতি (গর্ভবতী) অবস্থায় মারা যাওয়া নারীদের দাহ করা হতো নদীর একদম কাছের ওই শ্মশানঘাটে। শ্মশানের পাশেই ছিল এক বিশাল, গহীন বাঁশঝাড়। দিনের বেলাতেও ওই শ্মশানের ধারের রাস্তা দিয়ে একা হাঁটতে মানুষের গা ছমছম করত।
ঘটনার রাতটা কোনো সাধারণ রাত ছিল না। হিন্দু শাস্ত্র এবং সনাতন পঞ্জিকা অনুযায়ী ওই রাতটা ছিল বছরের সবচেয়ে ভয়ংকর এবং অশুভ রাত—কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথি, যা লোকমুখে ‘ভূত চতুর্দশী’ বা ‘নরক চতুর্দশী’ নামে পরিচিত। কালীপুজোর ঠিক আগের রাত। হিন্দু পুরাণ ও শাস্ত্র অনুযায়ী, এই ভূত চতুর্দশীর রাতে নরকের দরজা খুলে যায়। যমরাজ মর্ত্যে ১৪ পুরুষ বা পূর্বপুরুষদের আত্মাকে নেমে আসার অনুমতি দেন। কিন্তু ওই পবিত্র আত্মাদের সাথে সাথে পাতাল থেকে উঠে আসে অগণিত অতৃপ্ত প্রেত, পিশাচ, ডাকিনী, যোগিনী আর ডাইনিরা। এই অশুভ শক্তিদের হাত থেকে বাড়িকে রক্ষা করার জন্য সনাতন ধর্মে প্রতিটি গৃহস্থ বাড়িতে ১৪টি প্রদীপ (চৌদ্দ প্রদীপ) জ্বালানো হয় এবং ১৪ রকম শাক (চৌদ্দ শাক) খাওয়া হয়। বিশ্বাস করা হয়, ওই রাতে কেউ যদি ঘরের বাইরে একা বের হয়, বিশেষ করে শ্মশান বা গোরস্থানের আশেপাশে, তবে অশুভ আত্মারা তার ওপর ভর করে।
শীতের সেই রাতে আড়কান্দীতে কুয়াশা এতটাই ঘন ছিল যে, হাত দুয়েক দূরের জিনিসও ঠিকমতো দেখা যাচ্ছিল না। চন্দনা নদীর হিমশীতল বাতাসে মনে হচ্ছিল হাড়ের ভেতরের মজ্জা পর্যন্ত জমে বরফ হয়ে যাবে। ভবতোষ তখন চব্বিশ-পঁচিশ বছরের এক টগবগে যুবক। বাড়িতে সে, তার বয়স্কা মা, আর তার স্ত্রী কল্যাণী (ছদ্মনাম)। কল্যাণী তখন আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ভূত চতুর্দশীর শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে ভবতোষের মা বাড়ির চৌকাঠে, তুলসীতলায় এবং আনাচে-কানাচে ১৪টা মাটির প্রদীপ জ্বেলে দিয়েছেন, যাতে পূর্বপুরুষরা পথ চিনে আসতে পারেন এবং অশুভ শক্তি দূরে থাকে।
রাত তখন প্রায় ১১টা। হঠাৎ চন্দনা নদীর দিক থেকে একটা দমকা, পচা গন্ধযুক্ত বরফের মতো ঠান্ডা বাতাস ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকল। আর চোখের পলকে বাড়ির সবকটা প্রদীপ একসাথে দপ করে নিভে গেল! ঠিক সেই মুহূর্তেই কল্যাণীর গগনবিদারী চিৎকারে ভবতোষের বুক কেঁপে উঠল। ধড়মড় করে উঠে বসে ভবতোষ দেখে, কল্যাণী ব্যথায় বিছানায় ছটফট করছে। তার সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। অসময়ে প্রসব বেদনা শুরু হয়েছে! কিন্তু শুধু তাই নয়, কল্যাণীর চোখ দুটো অস্বাভাবিক বড় হয়ে গেছে। সে শূন্য দৃষ্টিতে ছাদের দিকে তাকিয়ে খসখসে, অচেনা গলায় গোঙাতে গোঙাতে বলছে, “ওরা চলে এসেছে… নরকের দরজা খুলে গেছে… ওরা রক্ত চায়… আমার বাচ্চাটাকে দিয়ে দে ভবতোষ…”
ভবতোষের মা ছুটে এলেন। কল্যাণীর অবস্থা দেখে তিনি শিউরে উঠলেন। গ্রামের এক বয়স্কা দাইমা (ধাত্রী) সেই রাতেই তাদের বাড়িতে ছিলেন। দাইমা কল্যাণীর নাড়ি ধরে আতঙ্কে পিছিয়ে গেলেন। দাইমা কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “ভবতোষ… এ তো শুধু প্রসব বেদনা নয় রে বাপ! আজ ভূত চতুর্দশীর রাত। প্রদীপ নিভে যাওয়ায় কোনো অশুভ পিশাচিনী বউমার ওপর ভর করেছে। ও তোর বাচ্চাকে পেটের ভেতরই মেরে ফেলতে চাইছে! এক্ষুনি যা! আড়কান্দী থেকে পাশের গ্রামে শিবনাথ কবিরাজ মশাই থাকেন (ছদ্মনাম)। শিবনাথের কাছে মহাকালের এমন ভস্ম আর শেকড় আছে যা না দিলে আজ রাতে বউমা আর তোর সন্তান কাউকেই বাঁচানো যাবে না। যা বাবা, দৌড়া!”
কিন্তু সমস্যা হলো, ওই গ্রামে যাওয়ার শর্টকাট রাস্তাটা গেছে ওই চন্দনা নদীর পাড় ঘেঁষে, বুড়ো শিবতলার মহাশ্মশানের ঠিক ভেতর দিয়ে। ভূত চতুর্দশীর এই কালরাতে, এত কুয়াশায় ওই শ্মশান পার হওয়া মানে সাক্ষাৎ মৃত্যুকে ডেকে আনা। কিন্তু ভবতোষের তখন অন্য কিছু ভাবার সময় নেই। চোখের সামনে স্ত্রী আর অনাগত সন্তান মৃত্যুর সাথে লড়ছে। ভবতোষ একটা বড় হ্যারিকেন ধরিয়ে নিল। গায়ে একটা মোটা উলের চাদর জড়িয়ে, মনে মনে গায়ত্রী মন্ত্র জপ করতে করতে সে বেরিয়ে পড়ল ঘন কুয়াশার চাদর ভেদ করে। আজ সে একা। তার সাথে কেউ নেই। পুরো আড়কান্দী গ্রাম শ্মশানের মতো নিস্তব্ধ। শুধু তার নিজের পায়ের মচমচ শব্দ আর দূরে কোথাও একটা রাতজাগা পেঁচার অদ্ভুত, অশুভ ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।
হাঁটতে হাঁটতে সে শ্মশানের সীমানার কাছাকাছি চলে এলো। বাতাসে বাঁশগাছগুলো একে অপরের সাথে ঘষা খেয়ে ‘কড়মড়-কড়মড়’ শব্দ তৈরি করছিল। অন্ধকারে মনে হচ্ছিল শত শত কঙ্কাল যেন একে অপরের হাড় চিবোচ্ছে। বাঁশঝাড় পার হতেই শ্মশানের মূল অংশ শুরু। কুয়াশা এখানে যেন আরও বেশি ঘন, প্রায় ধোঁয়ার মতো। চন্দনা নদীর দিক থেকে একটা কনকনে ঠান্ডা বাতাস ধেয়ে আসছে। আর সেই বাতাসের সাথে ভেসে আসছে এক অদ্ভুত, বমি-আসা গন্ধ। পোড়া মাংস, বাসি ঘি, আর পুরোনো পচা ফুল—সব মিলিয়ে এক নারকীয় দুর্গন্ধ। শ্মশানের ভেতর দিয়ে সরু মাটির রাস্তা। পথের দুই পাশে ইতস্তত ছড়িয়ে আছে আধপোড়া বাঁশের খাটলি, মটকা ভাঙার মাটির কলসির টুকরো, আর ছাইয়ের স্তূপ।
হঠাৎ ভবতোষ থমকে দাঁড়াল। শ্মশানের একদম মাঝখানে, নদীর পাড়ের কাছে একটা চিতা দাউদাউ করে জ্বলছে! হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী ভূত চতুর্দশীর রাতে শ্মশানে দাহকার্য নিষিদ্ধ থাকার কথা। তাহলে এত রাতে কে চিতা জ্বালাল? ভবতোষের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। সে হ্যারিকেনের আলোটা একটু উঁচু করল। আগুনের আবছা আলোয় সে যা দেখল, তাতে তার গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। চিতার ঠিক পাশেই একটা অর্ধমৃত ছাগল বলি দেওয়া অবস্থায় পড়ে আছে, তার রক্ত চুইয়ে চুইয়ে চিতার আগুনে পড়ছে। আর আগুনের ঠিক ওপাশে বসে আছে একজন নারী। পরনে একটা লাল পাড় সাদা শাড়ি, যা হিন্দু বিধবারা পরে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তার সিঁথিতে টকটকে লাল সিঁদুর লেপা, যা অন্ধকারের মধ্যেও রক্তের মতো জ্বলজ্বল করছে। মহিলাটি একটা মানুষের আধপোড়া ফিমার হাড় (পায়ের হাড়) দিয়ে চিতার মাংসগুলো খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নেড়ে দিচ্ছে। আর তার বাঁ হাতে ধরা মানুষের মাথার খুলি দিয়ে বানানো একটি পাত্র, হিন্দু শাস্ত্রে যাকে ‘কপালপাত্র’ বলা হয়।
ভবতোষ বুঝতে পারল, এটা কোনো সাধারণ দাহকার্য নয়। এটা চরম নিষিদ্ধ তন্ত্রসাধনা—‘শবসাধনা’। ভূত চতুর্দশীর রাতে অশুভ শক্তিকে তুষ্ট করার জন্য কিছু ভৈরব বা তান্ত্রিকরা এই ভয়ঙ্কর সাধনা করে থাকে। ভবতোষের পা মাটিতে গেঁথে গেল। সে প্রাণপণে ‘হনুমান চালিসা’ পড়ার চেষ্টা করল, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো স্বর বের হলো না। হঠাৎ… মহিলাটি হাড় নাড়ানো থামাল। সে ধীরে ধীরে, ঘাড় মটকে ভবতোষের দিকে তাকাল। ভবতোষের মনে হলো তার হৃদপিণ্ডটা স্তব্ধ হয়ে গেছে। মহিলার মুখটা বিভৎস। গালের চামড়া ঝুলে পড়েছে, চোখের কোটর দুটো একদম ফাঁকা—সেখানে কোনো মণি নেই, শুধু গভীর কালো গর্ত। আর তার ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আছে কয়লার মতো কালো, ধারালো কিছু দাঁত। ফাঁকা কোটর নিয়ে ভবতোষের দিকে তাকিয়ে মহিলাটি হঠাৎ খিকখিক করে হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দে শ্মশানের নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে গেল। অমানুষিক, কর্কশ একটা গলা দিয়ে সে বলে উঠল— “বউয়ের লাইগা ওষুধ নিতে যাস রে ভবতোষ? আজ যে ভূত চতুর্দশী… নরকের দরজা খোলা! আজ তো কেউ বাঁচে না! যা… যা… কিন্তু তোর বউ তো আজ আমার সাথে এই চিতায় পুড়বে… হি হি হি…”
ভবতোষ আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। সে হ্যারিকেনটা শক্ত করে চেপে ধরে অন্ধের মতো দৌড়াতে শুরু করল। পেছনে তখন সেই মহিলার বিকট অট্টহাসি আর চিতার কাঠ ফাটার ‘টাস-টাস’ শব্দ শ্মশান কাঁপিয়ে তুলছে। পাগলের মতো দৌড়ে ভবতোষ শ্মশান পার হয়ে পাশের ওই গ্রামে পৌঁছাল। শিবনাথ কবিরাজের বাড়ির দরজায় গিয়ে সে পাগলের মতো ধাক্কা দিতে লাগল। “কবিরাজ মশাই! ও কবিরাজ মশাই! দরজা খোলেন! আমার বউটা মরে যাবে!” বেশ কিছুক্ষণ পর একটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে কাঠের দরজাটা খুলল। শিবনাথ কবিরাজ একটা কুপি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু তাকে দেখে ভবতোষ একটু অবাক হলো। কবিরাজ মশাইয়ের শরীরটা কেমন যেন ফ্যাকাশে, চোখের নিচে গভীর কালি। তাকে খুব ক্লান্ত আর অসুস্থ দেখাচ্ছিল। তার সারা গা থেকে একটা কর্পূর আর ধূপের মিশ্র গন্ধ আসছিল, ঠিক যেমন গন্ধ মানুষের মৃত্যুর পর আসে। ভবতোষ হাঁপাতে হাঁপাতে সব খুলে বলল। শিবনাথ কবিরাজ কোনো কথা বললেন পরিচয় দিলেন না। তিনি শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর ধীরপায়ে ঘরের ভেতর গিয়ে একটা পুরোনো লাল শালুর কাপড়ে মোড়ানো পুঁটলি নিয়ে এলেন।
অত্যন্ত গম্ভীর আর ফিসফিসে গলায় কবিরাজ বললেন, “ভবতোষ, আমার শরীরটা আজ বড়ই খারাপ। আমি তো আর যেতে পারব না রে। এই পুঁটলিতে মহাকালের ভস্ম আর শ্বেত-আকন্দের শেকড় আছে। বাড়ি গিয়ে এটা গঙ্গাজলে মিশিয়ে কল্যাণীকে খাইয়ে দিবি। ও সুস্থ হয়ে যাবে।”
ভবতোষ পুঁটলিটা হাতে নিয়ে কৃতজ্ঞতায় কেঁদে ফেলল। সে যখন ফেরার জন্য পা বাড়াবে, ঠিক তখনই কবিরাজ মশাই তার হাতটা খপ করে চেপে ধরলেন। কবিরাজের হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা! কবিরাজ মশাই ফিসফিস করে বললেন, “ভবতোষ… একটা কথা মনে রাখিস। আজ ভূত চতুর্দশী। ফেরার পথে মহাশ্মশানের ঘাটে চন্দনা নদীর জলের দিকে একদম তাকাবি না। আজ ওই ঘাটে অতৃপ্ত ‘ডাকিনী’ আর ‘পেত্নী’দের মেলা বসে। কেউ যদি পেছন থেকে তোর নাম ধরে ডাকে, এমনকি তোর খুব কাছের মানুষের গলাতেও ডাকে… ভুল করেও পিছু ফিরবি না। ফিরলেই… তোর আত্মাকে তারা নরকের ওই খোলা দরজা দিয়ে সোজা পাতালে টেনে নিয়ে যাবে!”
ভবতোষ মাথা নেড়ে, বুকভরা সাহস নিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়াল। ফেরার পথে কুয়াশা যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। চারদিক একদম জমাট অন্ধকার। ভবতোষের হাতের হ্যারিকেনটা বারবার কেঁপে কেঁপে নিভে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে। সে পুঁটলিটা পকেটে শক্ত করে চেপে ধরে হনহন করে হাঁটতে লাগল। বাঁশঝাড় পার হয়ে সে আবার সেই মহাশ্মশানে প্রবেশ করল। আশ্চর্যজনকভাবে, যাওয়ার সময় সে যে বটগাছের নিচে জ্বলন্ত চিতা আর সেই ভয়ংকর তন্ত্রসাধিকা মহিলাকে দেখেছিল… এখন সেখানে কিচ্ছু নেই! একদম ঘুটঘুটে অন্ধকার। কোনো আগুন নেই, কোনো ছাই নেই।
ভবতোষ একটু স্বস্তি পেল। কিন্তু শ্মশানঘাটটা পার হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে… হঠাৎ বাতাসটা একদম মরে গেল। আর ঠিক সেই চরম নিস্তব্ধতার মধ্যে, চন্দনা নদীর দিক থেকে একটা শব্দ ভেসে এল। ‘ছলাৎ… ছলাৎ…’ কেউ যেন এই হাড়কাঁপানো শীতে, রাত আড়াইটার সময় চন্দনার বরফ-শীতল জলে নেমে গোসল করছে! সাথে একটা ভারী নুপুরের শব্দ… ‘ঝুম… ঝুম…’
ভবতোষের কবিরাজের কথা মনে পড়ে গেল। সে চোখ নিচু করে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল। সে প্রাণপণে ‘ওঁ নমঃ শিবায়’ জপ করতে শুরু করল। কিন্তু ঠিক তখনই… একটা গলা তাকে পেছন থেকে ডাকল। “ভবতোষ…”
ভবতোষের পা দুটো যেন আঠা দিয়ে মাটির সাথে আটকে গেল। এই গলা! এই গলা সে হাজার মানুষের ভিড়েও চিনতে পারবে। এটা কল্যাণীর গলা! তার স্ত্রীর গলা! “ভবতোষ… আমি আর ব্যথা সহ্য করতে পারছি কষ্টে গো… জলটা খুব ঠান্ডা… ওরা আমাকে টেনে নিয়ে এসেছে… আমাকে একটু তুলে ধরো না…” গলাটা একদম করুণ, ব্যথায় কাতর।
ভবতোষের মনটা হু হু করে উঠল। কল্যাণী এখানে কীভাবে এল? তবে কি সে মারা গেছে? তার আত্মা কি এই শ্মশানঘাটে আটকা পড়েছে? ভূত চতুর্দশীর রাতে কি তাহলে পিশাচরা সত্যিই তার স্ত্রীকে… “পিছু ফিরবি না…” কবিরাজের সাবধানবাণী ভবতোষের মাথায় বাজতে লাগল। কিন্তু একটা মানুষের মন কতক্ষণ স্থির থাকতে পারে যখন তার নিজের স্ত্রী পেছন থেকে এমন করুণ সুরে ডাকে? “ভবতোষ… আমাদের ছেলেটা যে জলে ডুবে যাচ্ছে… দেখো…”
এই কথা শোনার পর ভবতোষ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ঘাড় ঘুরিয়ে সে চন্দনা নদীর ঘাটের দিকে তাকাল। হ্যারিকেনের আলোটা নদীর ঘাটে গিয়ে পড়ল। যা সে দেখল, তাতে তার শরীরের রক্ত হিম হয়ে শিরায় শিরায় জমে গেল। নদীর হাঁটু-জলে দাঁড়িয়ে আছে কল্যাণী! তার পরনে সেই লাল পাড় সাদা শাড়ি, ঠিক যেমন শাড়ি পরা মহিলাকে সে চিতায় দেখেছিল। শরীর থেকে টপটপ করে জল ঝরছে। তার পেটটা একদম সমতল। আর তার কোলে একটা সাদা কাপড়ে মোড়ানো ছোট্ট পুঁটলি।
কল্যাণী ভবতোষের দিকে তাকিয়ে মায়াবী হাসল। তার কপালে টকটকে লাল সিঁদুর। সে বলল, “দেখো ভবতোষ… আমাদের ছেলে হয়েছে… দেখবে না?”
ভবতোষ সম্মোহিতের মতো ঘাটের দিকে এক পা এগিয়ে গেল। কল্যাণী ধীরে ধীরে সাদা কাপড়টা সরাল। ভবতোষের চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। কাপড়ের ভেতর কোনো মানবশিশু নেই! সেখানে রয়েছে খোদ ভবতোষেরই একটি মৃত, রক্তমাখা কাটা মাথা! নিজেরই সেই বিভৎস মুখের খোলা চোখ দুটো স্থির হয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে!
হঠাৎ কল্যাণীর মায়াবী মুখটা গলে গলে পড়তে শুরু করল। চামড়া খসে গিয়ে বেরিয়ে এল একটা বিভৎস, পচা-গলা কঙ্কালের মুখ। তার হাতের শাখা-পলাগুলো ঝনঝন করে উঠল। আর সেই বিভৎস মুখটা হাঁ করে এক পৈশাচিক, কান-ফাটানো অট্টহাসি দিয়ে ভবতোষের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল! ভবতোষ শুধু একটা বিকট চিৎকার করতে পারল। তারপর তার হাতের হ্যারিকেনটা ছিটকে পড়ল, আর সে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
পরদিন সকালে… গ্রামের মানুষ শ্মশানের ধারের রাস্তা থেকে ভবতোষকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করে। তার গায়ে তখন প্রচণ্ড জ্বর, সে প্রলাপ বকছে। চোখেমুখে এক চরম আতঙ্কের ছাপ। তাকে ধরাধরি করে যখন বাড়িতে আনা হলো, ভবতোষের জ্ঞান ফেরে। সে পাগলের মতো চিৎকার করে ওঠে, “কল্যাণী! কল্যাণী কোথায়? আমার বাচ্চা কোথায়?”
তার মা কাঁদতে কাঁদতে তাকে জড়িয়ে ধরেন। ভবতোষ দেখে, কল্যাণী বিছানায় শুয়ে আছে। সে বেঁচে আছে! আর তার পাশেই একটা ফুটফুটে সদ্যোজাত ছেলে ঘুমিয়ে আছে! মা বললেন, “কাল রাতে তুই চলে যাওয়ার আধা ঘণ্টা পরই বউমা ছেলে প্রসব করে। ভগবানের কৃপায় দুজনেই সুস্থ আছে রে ভবতোষ। ওই প্রদীপ নিভিয়ে দেওয়া দুষ্টু বাতাসটা আর ফিরে আসেনি। কিন্তু তুই ওই শ্মশানে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলি কেন?”
ভবতোষ কিছুই বুঝতে পারছিল না। যদি কল্যাণী আর বাচ্চা সুস্থই থাকে, তাহলে সে রাতে চন্দনার ঘাটে কাকে দেখল? আর শিবনাথ কবিরাজের ওষুধ? সে তার পকেটে হাত দিল। হ্যাঁ, লাল শালুর পুঁটলিটা আছে। সে পুঁটলিটা বের করে আনল। ভবতোষ বলল, “মা, পাশের গ্রামের শিবনাথ কবিরাজ মশাই এই ওষুধটা দিয়েছিলেন। এটা খাইয়ে দাও কল্যাণী'''কে, শরীর ভালো হবে।”
ভবতোষের মা হঠাৎ থমকে গেলেন। তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। তিনি কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন— “ভবতোষ… তুই কী পাগল হয়েছিস? ভূত চতুর্দশীর রাতে কার ওষুধের কথা বলছিস? পাশের গ্রামের শিবনাথ কবিরাজ তো গত পরশুদিন রাতে সাপের কামড়ে মারা গেছেন! গতকাল বিকালেই তো ওই মহাশ্মশানে তার দাহকার্য সম্পন্ন হয়েছে!”
ভবতোষের মাথায় যেন বাজ পড়ল! শিবনাথ কবিরাজ মারা গেছেন? তাহলে দাইমা-ই তো বলল তাকে কবিরাজের কাছে যেতে। তাহলে কাল রাতে পাশের ওই গ্রামে তাকে কে ওষুধ দিল? আর শ্মশানে ওই চিতা…! ভবতোষের হাত কাঁপতে শুরু করল। সে ধীরে ধীরে তার হাতের মুঠোয় থাকা সেই লাল শালুর পুঁটলিটা খুলল। পুঁটলির ভেতর কোনো মহাকালের ভস্ম বা শেকড় ছিল না। সেখানে ছিল… একমুঠো টাটকা, ধূসর রঙের চিতার ছাই! আর সেই ছাইয়ের ঠিক মাঝখানে রাখা ছিল… একটা ভাঙা শাঁখা এবং পলার টুকরো!
ভবতোষের গলা দিয়ে এক অস্ফুট গোঙানি বেরিয়ে এল। সে বুঝতে পারল, কাল রাতে সে আসলে কোনো জীবিত মানুষের মুখোমুখি হয়নি। ভূত চতুর্দশীর রাতে নরকের দরজা খুলে যাওয়ায়, শিবনাথ কবিরাজের সদ্য মৃত আত্মা বা তার রূপ ধরে স্বয়ং শ্মশানের কোনো পিশাচ তাকে মৃত্যুর ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করেছিল। আর নদীর ঘাটে কল্যাণীর রূপ ধরে যে তাকে ডাকছিল, সে ছিল শ্মশানের সেই অভিশপ্ত পিশাচিনী, যে পোয়াতি অবস্থায় মারা গিয়েছিল। ভবতোষ যদি সেই রাতে চন্দনার জলে পা রাখত, তবে আজ সে আর জীবিত থাকত না। আর আরেকটা বিষয়, দাইমাও জানত না যে কবিরাজ মারা গেছেন।
আজকের গল্প এখানেই শেষ হচ্ছে শ্রোতাবন্ধুরা। বিজ্ঞান হয়তো অনেক কিছুর ব্যাখ্যা দেয়, কিন্তু এই প্রাচীন জনপদগুলো, ওই বয়ে চলা চন্দনা নদী আর শত বছরের পুরনো শ্মশানের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে এমন কিছু রহস্য, এমন কিছু অশুভ তিথি, যা অন্ধকারের আড়ালে বসে আমাদেরই জন্য অপেক্ষা করে। আপনারা যারা এই মুহূর্তে একা বসে গল্পটা শুনছেন… একবার চারপাশটা খেয়াল করুন তো। আপনার কি মনে হচ্ছে আপনি সত্যিই একা? নাকি অন্ধকারের কোনো এক কোণ থেকে একজোড়া অদৃশ্য চোখ আপনার দিকেই তাকিয়ে আছে? মাঝরাতে যদি কেউ আপনার নাম ধরে ডাকে… ভুল করেও পিছু ফিরবেন পণ্ডিত না। কারণ সব ডাকের উত্তর দিতে নেই। আমি বাবু, ছিলাম আপনাদের সাথে হরর ওয়ার্ল্ড গ্লোবাল থেকে এই ভয়ংকর সফরে। ভালো থাকবেন, সাবধানে থাকবেন। আর হ্যাঁ… রাতে ঘুমানোর আগে দরজা-জানালাগুলো ঠিকমতো বন্ধ করেছেন তো? শুভরাত্রি। আল্লাহ হাফেজ।
অমাবস্যার রাতে মানুষের চোখের বোয়াল শিকার? ওরা একবার ডাকলে আর ছাড়েনা!
অমাবস্যার রাতে মানুষের চোখের বোয়াল শিকার? ওরা একবার ডাকলে আর ছাড়েনা!
215 Website Views
Video Transcript
আসসালামু আলাইকুম শ্রোতাবন্ধুরা…
আমি আরজে বাবু… হরর ওয়ার্ল্ড গ্লোবাল থেকে।
আজকের এই গভীর রাতে… আমি আপনাদের নিয়ে যাবো এক জায়গায়, যেখানে পদ্মার পানি শুধু ঢেউ তোলে না… ডাকে। ডাকে মানুষের নাম ধরে। ডাকে রক্ত-মাংসের লোভে।
এই গল্পটা পাঠিয়েছেন ইব্রাহিম মোর্শেদ… তাঁর নানুর মুখে শোনা। আনুমানিক সাল ১৯৪৫। ফরিদপুরের চরভদ্রাসনের কল্যাণপুর চর। চারদিকে কালো পানি, ঘন কাশবন, অমাবস্যার অন্ধকার যেন জীবন্ত।
তখন কল্যাণপুর চরে অভাবের আগুন জ্বলছে। মজিদ মিয়া—বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। চোখে ক্ষুধার ছায়া। তাঁর স্ত্রী রহিমা, সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। শরীর এত দুর্বল যে হাঁটতে গেলে পা কাঁপে। পেটে সন্তান, কিন্তু ঘরে খাবার নেই। রাতে রহিমা কেঁদে কেঁদে বলত, “মজিদ, আমি আর পারছি না… সন্তানটা যেন না মরে।”
ঘরে একমাত্র রফিক—মজিদের শ্যালক, বয়স মাত্র পঁচিশ। দুলাভাই-শ্যালকের সম্পর্ক।
সেই রাতে, অমাবস্যা। বাতাস থেমে আছে। ঘরের মাটির প্রদীপটা কাঁপছে। দুজনে বসে ফিসফিস করে পরামর্শ করছে।
রফিক বলল, গলা কাঁপা কাঁপা—
“দুলাভাই… আর উপায় নাই। রহিমা না খেলে সন্তান বাঁচবে না। আমি দেখেছি… ওর চোখ দুটো ডুবে যাচ্ছে।”
মজিদ অনেকক্ষণ চুপ। তারপর ধীরে ধীরে বলল—
“অমাবস্যার রাত… আজ কেউ ভয়ে পদ্মায় নামবে না। আজ আমরা পদ্মায় গেলে অনেক মাছ পাবো। পদ্মার গভীরে বড় বড় বোয়াল থাকে। চল। যা-ই হোক, একটা কিছু করতেই হবে।”
রহিমা দুর্বল হাতে মজিদের কাপড় ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল—
“যাইও না… অমাবস্যায় নদী ভালো না। আজ… আমি স্বপ্নে দেখেছি… কালো ছায়া আমার পিছু নিয়েছে।”
কিন্তু অভাবের কাছে কোনো স্বপ্ন টেকে না। দুজনে জাল নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
নদীর মাঝখানে পৌঁছাতেই… সবকিছু থেমে গেল। বাতাস মরে গেছে। পানির ছলাৎছল শব্দও যেন কেউ চেপে ধরেছে। চারদিকে কেবল কাশবনের ফিসফিস।
রফিকের গলা শুকিয়ে গেল। সে ফিসফিস করে বলল—
“দুলাভাই… খারাপ লাগতেছে। পানির নিচ থেকে কেউ আমাদের দেখতেছে। চলেন ফিরি।”
মজিদ জাল ফেলতে ফেলতে হাসল—কিন্তু সেই হাসি ভয়ংকর।
“চুপ। এখনই মাছ আসবে।”
হঠাৎ জালে প্রচণ্ড টান। নৌকা কেঁপে উঠল। দুজনে মিলে টানছে। পানি ফুঁড়ে উঠল এক বিশাল বোয়াল—প্রায় তিন হাত লম্বা। কিন্তু… এটা কোনো সাধারণ মাছ না। চোখ দুটো মানুষের মতো। গোল, কালো, পাতলা পর্দা দিয়ে ঢাকা। আর সেই চোখে… ভয়ঙ্কর ভাব। যেন বলছে— “আমাকে খা।”
রফিক চিৎকার করে উঠল—
“দুলাভাই! ফেলে দেন! এটা মাছ না… এটা… অন্য কিছু!”
কিন্তু মজিদের চোখ বদলে গেছে। তার মুখে এক অদ্ভুত হাসি। সে মাছটাকে দুই হাতে ধরে… কাঁচা কামড় দিল। রক্ত তার দাড়ি বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। মাছ ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে।
রফিক পাগলের মতো চিৎকার করছে—
“আল্লাহর ওয়াস্তে! থামেন!”
মজিদ মুখ তুলে তাকাল। চোখ পুরো কালো। কোনো সাদা অংশ নেই। সে বলল, গলা ভেজা ভেজা—
“তুইও আয়… ওরা অপেক্ষা করতেছে। ওদের ডাক শুনতে পাচ্ছিস না?”
তখনই নৌকা থমকে গেল। যেন নিচ থেকে শত শত হাত ধরে রেখেছে। চারদিক থেকে কণ্ঠস্বর ভেসে এলো—অসংখ্য, ভেজা, গম্ভীর:
“নিচে আয়… পদ্মার নিচে আয়… আমরা তোদের খাবার দিয়েছি… এবার তোরা আমাদের খাবার দে…”
হঠাৎ বিশাল ঢেউ। রফিক পানিতে পড়ে গেল। সে প্রাণপণ সাঁতরাচ্ছে। পিছনে তাকিয়ে দেখল—কালো কালো হাত, শুধু হাত… মজিদের গলা, বুক, পা জড়িয়ে ধরে টেনে নামাচ্ছে। মজিদ শেষবার চিৎকার করল—
“রফিক… পালা! রহিমাকে বাঁচা… ওদের ডাক… ওরা ছাড়ে না!”
তারপর… পানি শান্ত। শুধু একটা বুদবুদ উঠল।
তারপর হঠাৎ নীরবতা
রফিক বাড়ি ফিরল। কিন্তু সে আর স্বাভাবিক ছিল না। এই ঘটনার পর রহিমা স্বামী হারিয়ে ভেঙে পড়ে পাগলের মতো হয়ে যায়। রহিমা বলে, রফিক রাতে ঘুমের মধ্যে ফিসফিস করত—
“ওরা ডাকতেছে… পানির তলায়… আমাকে ডাকতেছে…”
কিন্তু রহিমা কিছুই বুঝত না। সে যদি রফিককে জিজ্ঞেস করত ওইদিন রাতে কী হয়েছিল, রফিক কিছু বলত না। এতটুকুই বলত, “সে আমাদের কাউকে বাঁচতে দিবে না।”
কয়েক সপ্তাহ পর, আরেক অমাবস্যায়… রহিমা রাতে দেখে রফিক ঘরে নাই। রহিমার মনে তখন সন্দেহ হলো, সে হয়তো নদীতে চলে গেছে। এটা ভেবেই রহিমা তাদের বাড়ির আশেপাশের লোকজন নিয়ে দ্রুত নদীর দিকে রওনা হলো। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। সবাই গিয়ে দেখে রফিক নদীর মাঝে চলে গেছে। এটা দেখে কিছু লোক ২টা নৌকা নিয়ে রফিককে ধরার জন্য রওনা দেয়। কিন্তু রফিককে ধরতে গেলে রফিক নিজেই নদীতে লাফ দেয়। আর তখন ঝড় উঠে আসে, রফিককে ধরতে পারে না। কিন্তু তাদের ভেতর থেকে এক ছেলে, নাম তার নজরুল, সে-ও লাফ দেয় রফিককে ধরার জন্য। কিন্তু সে রফিককে ধরতে পারে না, কিছু কালো হাত তখনই রফিককে পানির নিচে নিয়ে যায়।
কিন্তু তখনও ঢেউ কমে নাই। নজরুল হঠাৎ অনুভব করল তার পা কিসে যেন টেনে ধরছে। সে সজোরে পা ঝাপটা মারাতে নৌকার লোক বুঝতে পারে তার সাথে কিছু হচ্ছে। তখন দ্রুত তাকে নৌকায় উঠানো হয়। তখন বাতাস আরও বেড়ে যায়। এরপর তারা ধীরে ধীরে কিনারায় ফেরে। কিন্তু কিনারার লোকজন তখনও জানে না ঘটনা কী। পরে সব ঘটনা শোনে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, ওখানে এত বাতাস, এত কিছু, তীরে থেকে নাকি কেউ কোনো বাতাস বা ঢেউ অনুভব করে নাই!
এই ঘটনার পর নজরুলের কঠিন জ্বর আসে, আর জ্বরে সে ফিসফিস করে কী যেন বলতে থাকে— “আমরা তোদের খাবার দিয়েছি… এবার তোরা আমাদের খাবার দে…”।
এরপর রহিমার অবস্থাও আরও খারাপ হতে থাকে। এর কয়েকদিন পর দুপুরে রহিমা যায় নদীতে পানি আনতে। কিন্তু সে হাঁটু পানিতে নেমে আর ওঠে না। তার মুখও স্বাভাবিক না, কেমন যেন ফ্যাকাশে। আর সে ফিসফিস করে বলছে, “ওরা আমাকেও নিয়ে যাবে।” আর কী যেন বলল বোঝা গেল না। এরপর তার সাথের লোক তাকে রেখেই ভয়ে তীরে উঠে মানুষজন জড়ো করল। কিন্তু তখন সে ভয়ানক কণ্ঠে বলতেছে, “আমরা তোদের খাবার দিয়েছি… এবার তোরা আমাদের খাবার দে…”। এরপর সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। সবাই ধরে তাকে উঠায়, কিন্তু এরপর তার অবস্থাও খারাপ হতে থাকে।
এদিকে নজরুলও এখনও সুস্থ হয় নাই। এতে গ্রামের মানুষ একটা চিন্তায় পড়ে যায় যে, এরপর কার পালা। তখন গ্রামের সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা কবিরাজের কাছে যাবে। কিন্তু ওই চরে তেমন ভালো কোনো কবিরাজ নাই। এদিক দিয়ে নজরুল ও রহিমার অবস্থাও আরও খারাপ। তার থেকে বেশি ভয় পাচ্ছে, আবার অমাবস্যা চলে আসতেছে। কিন্তু কীভাবে কী করবে কেউ বুঝতেছে না। তখন গ্রামের কিছু লোক মিলে পাশের গ্রামের কফিলুদ্দিন কবিরাজের কাছে যায়। সে আসে এবং রহিমা ও নজরুলকে দেখে খুব ভয় পেয়ে যায়। বলে, “এটা আমার দ্বারা সম্ভব না।” তখন গ্রামের লোকজন আরও চিন্তায় পড়ে যায়। সবাই কফিলুদ্দিন কবিরাজকে বলে, “এখন আমরা কী করতে পারি?” তখন সে বলল, “আমি একজনকে চিনি, সালেপুর চর তার গ্রাম, মালেক কবিরাজ।”
তখন সবাই মালেক কবিরাজকে আনে। মালেক কবিরাজ নজরুলকে দেখে মনে মনে কিছুটা চমকে গেলেন, তবে মুখে তা প্রকাশ করলেন না। গম্ভীর গলায় কবিরাজ বললেন, “শোনো, এই কাজটা সহজ না। আর এই কাজ আমার একা করা সম্ভবও না। এই কাজ করার জন্য প্রচুর সাহসী একজন লোক লাগবে যে মৃত্যুকে ভয় করে না।”
কিন্তু কেউ রাজি হয় না। হঠাৎ একটা ছেলে বলে, “আমি পারব এই কাজ।” তার বয়স হবে ১৮ থেকে ১৯, কেবল একটু লম্বা হয়ে উঠছে। সে বলে, “কী করতে হবে আমাকে বলেন।” তখন ওই ছেলের মা বলে, “কবিরাজ সাব, কিছু মনে করবেন না। আমার ছেলে না বুঝে বলে ফেলছে, সে এতটা সাহসী না।” সে কান্নাকাটি করে তার ছেলেকে অনেক নিষেধ করল। কিন্তু তার ছেলের সোজা একটা উত্তর ছিল, “পৃথিবীতে জন্ম যখন হইছে, তাহলে মৃত্যু একদিন হবেই। ২ জীবন চলে গেছে, আর ২টা জীবন মৃত্যুর মুখে, কীভাবে আমি পারি বসে থাকতে? আর তাছাড়াও এই সমস্যার সমাধান না করলে আর কত জীবন চলে যাবে সেটারও ঠিক নাই।”
এই বলে ছেলেটা বলে, “কবিরাজ, আমি ভয় পাই না। আপনি দায়িত্বটা দেন।”
ঘটনার এই পর্যায়ে একটা বিষয় বলে রাখি আপনাদের অনেকেরই মনে এই প্রশ্ন জাগতে পারে—এই মা-ছেলে কে? হঠাৎ কোথা থেকে আসলো? এটা ঘটনার শেষে বলব, শুনতে থাকুন।
এরপর কবিরাজ তাকে দায়িত্ব দেয়। কবিরাজ বলে, “মাটির পাতিলটা নিতে হবে এক দামে, কোনো দরাদরি করা চলবে না। দরাদরি করলেই এর গুণাগুণ শেষ।”
কবিরাজ আগুনের শিখার দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন, “তোমাকে সাতটি ভিন্ন গ্রাম থেকে সাতটি শ্বেত শিমুল—অর্থাৎ সাদা মান্দার গাছের ছোট চারা তুলতে হবে। তবে শর্ত আছে! চারাগুলো শিকড়সহ অক্ষত অবস্থায় তুলতে হবে এবং প্রতিটা চারা তোলার সময় দম বন্ধ রাখতে হবে। এক নিশ্বাসে একটা গাছ মাটি থেকে উপড়ে আনতে হবে। যদি মাঝপথে দম ছেড়ে দাও, তবে সব পরিশ্রম বৃথা যাবে।”
কবিরাজ একটু থেমে তার দিকে তপ্ত দৃষ্টিতে চেয়ে যোগ করলেন, “সাত গ্রাম ঘুরে যখন সাতটি চারা তোমার হাতে আসবে, তখন ঠিক অমাবস্যার নিশুতি রাতে এই গ্রামের দক্ষিণ পাড়ার শ্মশানের ধারের ওই পুরনো বটগাছটার নিচে এসে দাঁড়াবে। মনে রেখো, ফেরার পথে পেছনে কেউ ডাকলেও ঘাড় ফেরানো যাবে না। যদি সাহস হারিয়ে একবার পেছনে তাকাও, তবে তোমার জেদ আর প্রাণ—দুইটাই সংকটে পড়বে। পারবে তো?”
সে কোনো দ্বিধা ছাড়াই মাথা নেড়ে বলল, “আমি পারব। কাল সূর্য ডোবার আগেই সাত গ্রামের সাত মান্দার আপনার সামনে থাকবে।”
এরপর কবিরাজ বলে দিলো, “আগামী অমাবস্যায় রহিমা ও নজরুলকে আপনারা চোখের আড়াল হতে দেবেন না এবং অমাবস্যার রাতে তাদের ঘর থেকে বের হতে দেবেন না। সবাই সজাগ থাকবেন ও তাদের দিকে খেয়াল রাখবেন।”
এরপর সবাই তাদের দুজনকে এক জায়গায় করে রাত পার করতে লাগল। কিন্তু সেই রাতটা স্বাভাবিক ছিল না। নজরুল আর রহিমা ফিসফিস করে বলতেই থাকল। হঠাৎ আনুমানিক রাত ২টার দিকে প্রচুর বেগে ঝড়-বাতাস ও বৃষ্টি শুরু হয়। ওদিকে মালেক কবিরাজ ধ্যানে, ওই সাহসী ছেলেকে সে একা ছাড়ে নাই। সে ধ্যানে বসে দেখে সেই ছেলেটা খুব বিপদে আছে। তখন সে শক্তিশালী ২টা জিন পাঠায়। কিন্তু সেই ছেলেটা এ ব্যাপারে কিছুই জানত না।
সে যখন ষষ্ঠ গ্রাম পার হয়ে সপ্তম গ্রামে পৌঁছাল, তখন তার শরীর আর চলছে না। টানা ছয়টি গ্রাম থেকে এক নিশ্বাসে মান্দার গাছ উপড়ে আনতে গিয়ে তার ফুসফুস ফেটে যাওয়ার উপক্রম। শরীর ঘামে ভেজা, আর চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল হয়ে আছে।
সপ্তম গ্রামের শ্মশান সংলগ্ন সেই নির্দিষ্ট মান্দার গাছটির সামনে গিয়ে সে যখন হাত বাড়াল, ঠিক তখনই এক কালো ছায়ামূর্তি তার সামনে এসে দাঁড়াল। এক বিকট অট্টহাসিতে চারপাশ কেঁপে উঠল, যেন বাতাসও থমকে গেছে। সে নিশ্বাস বন্ধ করে গাছটি ধরার চেষ্টা করতেই এক অদৃশ্য শক্তি তাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে দূরে ছিটকে ফেলে দিল।
তার জেদি মন হার মানতে নারাজ, কিন্তু শরীর আর সায় দিচ্ছে না। সে যখন প্রায় জ্ঞান হারানোর পথে এবং তার হাতের মুঠো থেকে আগের সংগৃহীত গাছগুলো আলগা হয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই মালেক কবিরাজের পাঠানো সেই দুই শক্তিশালী ভালো জিন আবির্ভূত হলো।
যখন সেই কালো ছায়ামূর্তি তাকে পুনরায় আক্রমণ করতে চাইল, তখন প্রথম জিনটি তার বিশাল নুরানি হাত বাড়িয়ে সেই অশুভ শক্তিকে দেয়ালের মতো আটকে দিল। বাতাসের গতিপথ পরিবর্তন করে সে ছেলেটির চারপাশে এক সুরক্ষাকবচ তৈরি করল, যাতে বাইরের কোনো বাধা তাকে আর স্পর্শ করতে না পারে।
দ্বিতীয় জিনটি পরম মমতায় ছেলেটির কানে ফিসফিস করে পবিত্র কিছু শব্দ উচ্চারণ করল। এতে মুহূর্তের মধ্যে তার শরীরের সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে গেল এবং ফুসফুসে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার হলো। সে অনুভব করল তার বাহুতে যেন দশজন মানুষের শক্তি ভর করেছে।
জিনের দেওয়া সেই অসীম শক্তিতে বলীয়ান হয়ে সে শেষবারের মতো নিশ্বাস বন্ধ করে ঝাঁপিয়ে পড়ল। মাটির গভীর থেকে সেই জেদি শ্বেত শিমুলের শিকড়গুলো যেন লোহার শেকলের মতো আটকে ছিল, কিন্তু এবার তার এক হ্যাঁচকা টানে মাটি বিদীর্ণ করে গাছটি উপরে চলে এল।
গাছটি হাতে আসতেই এক নিশ্বাসে সে চিৎকার করে উঠল না, বরং ধীরস্থিরভাবে উঠে দাঁড়াল। সে জানত না মালেক কবিরাজ তাকে নজর রাখছেন, কিন্তু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই দুই অদৃশ্য প্রহরী মুচকি হেসে বাতাসের সাথে মিলিয়ে গেল।
এরপর সাত গ্রামের সাতটি শ্বেত শিমুল (মান্দার) গাছ নিয়ে যখন সে হন্তদন্ত হয়ে মালেক কবিরাজের ডেরায় ফিরল, তখন কবিরাজের মুখে এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি। কবিরাজ তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে গম্ভীর গলায় বললেন, “সাবাস বেটা! তুই পেরেছিস। কিন্তু জানিস কি, একসময় তোর দম যখন প্রায় ফুরিয়ে আসছিল, তখন তুই একা ছিলি না?”
সে অবাক হয়ে কবিরাজের দিকে তাকাল। কবিরাজ মুচকি হেসে বললেন, “তোর জেদ আমাকে মুগ্ধ করেছে, তাই তোর জীবন বাঁচাতে আমি আমার অনুগত শক্তিশালী দুই ভালো জিনকে পাঠিয়েছিলাম। তারা না থাকলে আজ তোর জান আর মান—দুইটাই যেত।”
সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কবিরাজ তার কাঁধে হাত রেখে আবার বলতে লাগলেন, “তবে বাপু, ভেবো না যে কাজ শেষ হয়ে গেছে। আসল খেলা তো এখনো শুরুই হয়নি! আগামী পূর্ণিমার রাতে আমরা আবার বসব রহিমা ও নজরুলকে নিয়ে। ওইদিন সব কালো শক্তি ভয়ে থাকে।”
এসে পড়ল সেই ভয়ানক পূর্ণিমা।
মালেক কবিরাজ সেই সাতটি শ্বেত শিমুল বা মান্দার গাছ হাতে নিয়ে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি হাসলেন। কিন্তু সময় নষ্ট করার মতো অবস্থা তখন ছিল না। পূর্ণিমা খন মধ্যগগনে। বাইরে বাতাসের হাহাকার আর ঘরের ভেতর নজরুল ও রহিমার গোঙানি মিলে এক নারকীয় পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
মালেক কবিরাজ গর্জে উঠলেন—
“সবাই ঘর থেকে বের হয়ে যাও! শুধু এই সাহসী ছেলেটা আর আমি ভেতরে থাকব। খবরদার, ফজরের আজান না হওয়া পর্যন্ত ঘরের দরজায় টোকা দেবে না, এমনকি কোনো চিৎকার শুনলেও না!”
সবাই ভয়ে ভয়ে বাইরে চলে গেল। কবিরাজ ঘরের মাঝখানে একটি বড় মাটির গামলা রাখলেন। তাতে নদীর পানি ভরে সাতটি গ্রামের সেই সাতটি মান্দার গাছের ডাল ভিজিয়ে দিলেন। এরপর পকেট থেকে বের করলেন পুরনো আমলের একটা তামাটে রঙের আংটি আর কিছু বিশেষ শেকড়-বাকড়।
নজরুল ও রহিমার অবস্থা তখন চরমে—
হঠাৎ নজরুল বিড়বিড় করা বন্ধ করে বিকট চিৎকার দিয়ে উঠল। তার চোখ দুটো মজিদ মিয়ার মতো কুচকুচে কালো হয়ে গেছে। সে খাটের ওপর বসে দুলতে দুলতে বলতে লাগল, “আমাদের খাবার ফেরত দে... নাহলে তোদের কলিজা খাব!” রহিমাও একই সুরে অদ্ভুত এক ভাষায় কথা বলতে শুরু করল যা সাধারণ মানুষের বোঝার বাইরে।
মালেক কবিরাজ একটুও না ঘাবড়ে সেই সাতটি মান্দার ডাল একসাথে মুঠোয় নিয়ে নজরুল ও রহিমার গায়ে নদীর পানি ছিটিয়ে দিতে লাগলেন। মুখে তার অবিরাম মন্ত্র। একেকবার পানি ছিটান, আর নজরুল-রহিমা যন্ত্রণায় ছটফট করে ওঠে। যেন আগুনের হলকা তাদের শরীরে লাগছে।
কবিরাজ তখন সেই সাহসী ছেলেটিকে নির্দেশ দিলেন—
“এই পাতিলটা ধর! এই পাতিলের ভেতরেই সব অশুভ শক্তিকে বন্দি করতে হবে। আমি যখন বলব ‘বন্ধ কর’, তখন তুই এক মুহূর্ত দেরি না করে মাটির সরা দিয়ে মুখটা চেপে ধরবি!”
হঠাৎ ঘরের প্রদীপটা নিভে গেল। ঘোর অন্ধকারের মধ্যে শোনা গেল শত শত মানুষের ভেজা পায়ের শব্দ। যেন পদ্মা নদীর তলদেশ থেকে সেই অশরীরী আত্মাগুলো উঠে এসেছে তাদের সঙ্গীদের নিয়ে যেতে। ঘরের দেয়ালগুলো কাঁপতে লাগল। মালেক কবিরাজ তার হাতের লাঠি দিয়ে মাটিতে সজোরে আঘাত করে চিৎকার করলেন—
“তোদের সময় শেষ! যেখান থেকে এসেছিস, সেখানেই ফিরে যা!”
এক অদৃশ্য যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল ঘরের ভেতর। নজরুল আর রহিমার মুখ থেকে ধোঁয়ার মতো কালো কিছু একটা বের হয়ে সেই মাটির পাতিলের দিকে আকৃষ্ট হতে লাগল। তারা দুজনে তখন নিস্তেজ হয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। পাতিলটা তখন প্রচণ্ড কাঁপছে, যেন ভেতরে কিছু একটা জানোয়ারের মতো ছটফট করছে।
কবিরাজ হাঁক দিলেন—
“এখনই! মুখ বন্ধ কর!”
ছেলেটি কালক্ষেপণ না করে মাটির সরা দিয়ে পাতিলের মুখ বন্ধ করে দিল। মালেক কবিরাজ দ্রুত একটি লাল কাপড় দিয়ে পাতিলের মুখ বেঁধে দিলেন এবং তাতে নিজের রক্ত দিয়ে বিশেষ নকশা এঁকে দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে বাইরের ঝড় থেমে গেল। কাশবনের ফিসফিসানি আর নেই। চারদিকের গুমোট ভাবটা কেটে গিয়ে এক পবিত্র প্রশান্তি নেমে এলো।
কবিরাজ ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। চর কল্যাণপুর আজ বেঁচে গেছে।
পরদিন সকালে গ্রামের মানুষ আনন্দে আত্মহারা। রহিমা আর নজরুল পুরোপুরি সুস্থ। গ্রামের মানুষ আর মুরব্বিরা মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন, যে ছেলেটার অসীম সাহসে আজ গ্রামটা রক্ষা পেল, তাকে আর তার মাকে পুরস্কৃত করবেন।
কিন্তু… চমকে ওঠার মতো ঘটনা ঘটল তখনই!
পুরো চর কল্যাণপুর তন্নতন্ন করে খোঁজা হলো। কিন্তু সেই সাহসী ছেলে বা তার মায়ের কোনো খোঁজই মিলল না! তখন গ্রামের মানুষের হঠাৎ হুঁশ ফিরল— আরে, এই ছেলে আর তার মাকে তো আগে কখনো এই গ্রামে দেখা যায়নি! তাদের নামও তো কেউ জানে না!
এমনকি যে রাতে কফিলুদ্দিন কবিরাজের সামনে ছেলেটা নিজে থেকে দায়িত্ব নিয়েছিল, তার আগে এই গ্রামে তাদের অস্তিত্বের কথা কেউ টেরই পায়নি। তারা কারা ছিল? কোথা থেকে এসেছিল? আর কাজ শেষ হতেই বা কোথায় হাওয়ায় মিলিয়ে গেল?
গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠরা বলাবলি শুরু করলেন, “এরা হয়তো সাধারণ কোনো মানুষ ছিল না। আল্লাহর অশেষ রহমতে, এই অভাগা গ্রামের মানুষদের উপকার করার জন্যই হয়তো তারা রূপ ধরে এসেছিল।”
সত্যিটা কী, তা আজও কেউ জানতে পারেনি। সেই মা-ছেলের পরিচয় আজও চর কল্যাণপুরের মানুষের কাছে এক অমীমাংসিত রহস্য হয়েই রয়ে গেছে।
আর সেই পাতিলা? মালেক কবিরাজ সেটা নিয়ে গিয়েছিলেন অনেক দূরে, মাঝদরিয়ায়… এমন এক গভীর জায়গায় ফেলে দিয়েছিলেন যাতে সেটা আর সহজে কারও জালে বা হাতের নাগালে না পড়ে।
আজকের হরর ওয়ার্ল্ড এখানেই শেষ। শুনেছেন তো? সাবধান… অমাবস্যার রাতে পদ্মার ধারে যাবেন না। ওরা এখনও ডাকতে পারে…
আসসালামু আলাইকুম।